স্বধর্ম নিধনং শ্রেয় পরধর্ম ভয়াবহ।
SwāDhārmā nidhāng Sraeya paro-Dhārma Bhyavah
গীতার এই শ্লোকাংশের সহজ ও গভীর অর্থ হলো—নিজের সহজাত স্বভাব ও স্বীয় ধর্মের পথে থেকে যদি কারও মৃত্যুও হয়, তাও কল্যাণকর; কিন্তু অন্যের অনুকরণীয় পথ বা পরধর্ম অবলম্বন করা ভয়াবহ ও বিনাশকারী। এখানে স্পষ্ট করে বোঝা প্রয়োজন, সনাতন দর্শনে ‘ধর্ম’ মানে কোনো পশ্চিমী ‘Religion’, নির্দিষ্ট ‘মযহব’ বা আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো অপরিবর্তনীয় ‘Heavenly Rule Book’-এর লিখিত ফরমান নয়।
ধর্ম হলো তা-ই, যা ধারণ করে কোনো জীব বা জড় পদার্থের মূল বৈশিষ্ট্য, অস্তিত্ব ও নৈতিক সত্তা রক্ষিত হয়—যেমন জলের ধর্ম শীতলতা, অগ্নির ধর্ম দহন। ইতিহাস সাক্ষী, ভারতে যুগ যুগ ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর বহিরাগত শক্তির চাপিয়ে দেওয়া ধর্মান্তকরণ এবং সেই ভিন্ন ‘Heavenly Rule Book’-এর অন্ধ নিয়মনিষ্ঠা অনুসরণের ফলেই আজকের এই বিভ্রান্তিকর ও মর্মান্তিক পরিণতি, যার নিয়ন্ত্রণ আজ আর আমাদের কারও হাতে নেই।
আসলে কী ঘটেছে?
রিয়াধ ও মক্কা থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জানা যাচ্ছে—সৌদি আরবের মাটিতে অত্যন্ত কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় শিরশ্ছেদ করা হয়েছে দুই বাংলাদেশী নাগরিককে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, মক্কা শহরের কোনো এক মসজিদের প্রাঙ্গণে বা চত্বরে তাঁরা নাকি ‘অনৈতিক কাজ’ করেছেন। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তাঁরা পরস্পর বিবাহিত কিংবা প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন এবং প্রাঙ্গণে ঘনিষ্ঠতা বা চুম্বন করেছিলেন। যদিও সৌদি সরকারি ঘোষণায় এই ‘অনৈতিক কাজের’ সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়নি, তবুও কয়েক মাসের শুনানির পর ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অত্যন্ত বিস্ময়কর ও মর্মান্তিক বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে সময়মতো কূটনৈতিকভাবে কিছু না জানিয়ে গোপনে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করে সরাসরি প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ইসলাম ধর্মের এই বিধানের উৎস ও আইনি ভিত্তি
ইসলামি ফৌজদারি আইনে শাস্তি মূলত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত: ‘হদ’ (কুরআন ও হাদিসে নির্ধারিত নির্দিষ্ট শাস্তি) এবং ‘তাজির’ (বিচারক বা শাসকের বিবেচনাধীন শাস্তি)।
- ব্যভিচার ও হদ সংক্রান্ত নির্দেশ: পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূরের ২ নম্বর আয়াতে অবিবাহিতদের ব্যভিচারের ক্ষেত্রে একশত বেত্রাঘাতের নির্দেশ রয়েছে: “ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত কর…” (সূরা আন-নূর, ২৪:২)। হাদিসভিত্তিক শারিয়া বিধান অনুযায়ী, বিবাহিত ব্যভিচারীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড (রজম)-এর চর্চাও ইসলামি আইনের ইতিহাসে দেখা যায়।
- তাজিরের প্রয়োগ: তবে এই বাংলাদেশী যুগলের ক্ষেত্রে কোনো প্রত্যক্ষ চারজন চাক্ষুষ সাক্ষীভিত্তিক ‘হদ’ কায়েম করা হয়নি; সৌদি আদালতের তথ্যানুযায়ী শাস্তি দেওয়া হয়েছে ‘তাজির’ (বিচারকের নিজস্ব বিবেচনা)-এর ভিত্তিতে। ঐতিহ্যবাহী চার মাযহাবের (হানাফি, শাফেয়ী, মালিকি, হাম্বলী) মূলনীতি ও সহিহ হাদিসের একাধিক বর্ণনা অনুযায়ী তাজিরের সর্বোচ্চ শাস্তি বেত্রাঘাত বা কারাদণ্ড হওয়ার কথা থাকলেও, আধুনিক সৌদি বিচারব্যবস্থা ‘তাজিরান বিল ক্বাতল’ (বিবেচনাধীন মৃত্যুদণ্ড) প্রয়োগ করে এই রায় কার্যকর করেছে, যা ধর্মীয় মহলেও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এই বিধান কি মানবিক, নাকি অমানবিক?
আধুনিক মানবসমাজ ও সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের মানদণ্ডে বিচার করলে এই রায়কে চরম অমানবিক ও অসঙ্গতিপূর্ণ বলেই গণ্য করা ছাড়া উপায় থাকে না।
যেখানে কোনো হিংসা, সন্ত্রাস, বলপ্রয়োগ বা রক্তপাত ঘটেনি—পারস্পরিক সম্মতিভিত্তিক সামান্য স্পর্শ বা মানবিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগের জবাবে একটি প্রাণ সম্পূর্ণ বিনাশ করে দেওয়া ন্যায়বিচার হতে পারে না। মানবিক আইনের মূল ভিত্তি হলো ‘অনুপাতিক বিচার’ (Proportionality of Justice)। তুচ্ছ বা প্রতীকী অনৈতিকতার দায়ে তরবারির এক আঘাতে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ন্যায়ের পরিপন্থী, অন্যদিকে তা ব্যক্তির শুধরে ওঠার সুযোগ চিরতরে মুছে দেয়।
ভারতে সনাতন হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ এমন কাজ করলে কী হতো?
ভারতের মাটিতে কোনো সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিক যদি কোনো মন্দিরে বা পবিত্র স্থানে অনুরূপ কোনো অনৈতিক বা অসৌজন্যমূলক আচরণ করত, তবে তার পরিণতি কখনোই প্রাণঘাতী হতো না।
- সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া: ভারতীয় আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোয় মন্দির প্রাঙ্গণে অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য সর্বোচ্চ জনসাধারণের শান্তিভঙ্গের অভিযোগ (Public Nuisance), সামান্য জরিমানা বা মন্দির কমিটি কর্তৃক বহিষ্কারের ব্যবস্থা হতো।
- ধর্মীয় ঐতিহ্যগত আচরণ: সনাতন ঐতিহ্যে মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষক ও পুরোহিতরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক করতেন, ভর্ৎসনা করতেন বা সর্বোচ্চ মন্দির চত্বর থেকে বের করে দিতেন। কোনো মন্দির কমিটি, পুরোহিত সমাজ বা আদালত কারও শিরশ্ছেদ করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না।
অজ্ঞতা, অপরাধ ও পাপের প্রায়শ্চিত্ত: সনাতন ও মানবিক বিচার
সনাতন দর্শন মানুষকে কখনোই ‘আজন্ম পাপী’ হিসেবে দেখে না; মানুষের ভুলকে দেখে ‘অজ্ঞানতা’ (অবিদ্যা) হিসেবে। সনাতন ও মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচার করলে তিনটি মৌলিক সত্য সামনে আসে:
- পাপ বনাম অপরাধ: সনাতন ধর্মে ধর্মাচরণ লঙ্ঘন হলো নৈতিক স্খলন বা ‘পাপ’, যা সংশোধনযোগ্য। আর হিংসা বা অপহরণ হলো রাষ্ট্রীয় ‘অপরাধ’। পাপের জন্য বিধান হলো প্রায়শ্চিত্ত—যেমন অনুশোচনা, উপবাস, গঙ্গাস্নান, দান বা সমাজসেবা। মানুষের চৈতন্যকে উন্নত করাই সনাতন ব্যবস্থার লক্ষ্য, দেহকে ধ্বংস করা নয়।
- অনুপাতিক দণ্ড (যথা-অপরাধ দণ্ড): মহাভারতের শান্তিপর্বে ভীষ্মদেব ও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে—রাজার দণ্ড হতে হবে অপরাধের মাত্রার সমতুল্য। যেখানে কোনো রক্তপাত হয়নি, সেখানে রক্ত ঝরানো স্বয়ং অধর্ম।
- আত্মার রূপান্তর: সনাতন চেতনা বিশ্বাস করে, প্রতিটি জীবের মধ্যেই আত্মা বিরাজমান। ভুল করা মানুষের প্রকৃতি, কিন্তু ক্ষমা ও সংশোধনের সুযোগ দেওয়া ধর্মের প্রকৃত রূপ।
সমাপ্তি সংবাদ :
কেবল রক্ত-মাংসের অবয়ব নিয়ে জন্ম নিলেই প্রকৃত অর্থে মানুষ হওয়া যায় না; বিবেকহীন ও মোহগ্রস্ত হলে মানুষও বস্তুত কাম, ক্রোধ আর অন্ধ সংস্কারের শিকলে বাঁধা অবুঝ পশুর মতো—এক পাশবদ্ধ জীব। শাস্ত্রের অমোঘ সত্য তাই স্মরণ করিয়ে দেয়:
আহার-নিদ্রা-ভয়-মৈথুনং চ সামান্যমেতৎ পশুভির্নরাণাম্। ধর্মো হি তেষামধিকো বিশেষো ধর্মেণ হীনাঃ পশুভিঃ সমানাঃ॥
আহার, নিদ্রা, ভয় ও প্রজননের প্রবৃত্তি মানুষ এবং পশুর মধ্যে অভিন্ন। কেবল সৎ ধর্মচেতনা, বিবেক এবং আত্মজ্ঞানই মানুষকে পশুর স্তর থেকে দেবত্বে উন্নীত করে। সেই শাশ্বত জ্ঞান ও বোধের অভাবে মানুষ যখন অন্ধ বিধিনিষেধের দাস হয়ে নিজের ও পরের বিনাশ ডেকে আনে, তখনই ঘটে মানবতার চরম অবমূল্যায়ন।
এই গভীর সংকট ও ভ্রান্তি থেকে মুক্তি পেতে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিভ্রান্ত মানবজাতিকে অভয় দিয়ে ঘোষণা করেছেন:
সর্বধর্মান্পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ॥ (গীতা ১৮/৬৬)
“সমস্ত কৃত্রিম বিধিনিষেধ ও মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব পরিত্যাগ করে কেবল পরম সত্যস্বরূপ আমার শরণ গ্রহণ করো। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ ও ক্লেশ থেকে মুক্ত করব; কোনো শোক বা ভয় করো না।”
ভয়, তলোয়ার কিংবা অন্ধ মতবাদের নিগড়ে বাঁধা পরধর্মের মরীচিকা ছেড়ে সনাতন সত্যের উদার বুকে ফিরে আসার দ্বার চিরকাল উন্মুক্ত। সনাতন কোনো সংকীর্ণ গোষ্ঠী নয়, কোনো ভৌগোলিক গণ্ডি নয়—এ হলো বিশ্বাত্মা ও নিখিল সৃষ্টির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার পরম মার্গ। স্বধর্মের এই চিরন্তন উৎসে প্রত্যাবর্তনই পারে অবুঝ পাশবিক বৃত্তিকে নির্মূল করে মানবজাতিকে প্রকৃত আত্মমর্যাদা ও প্রেমময় প্রজ্ঞার আলো দেখাতে।
সমগ্র বিশ্বে শান্তি, ন্যায় এবং নিষ্কলঙ্ক মানবিকতা তখনই পুনপ্রতিষ্ঠিত হবে, যখন মানুষ কৃত্রিম সংস্কারের শৃঙ্খল ভেঙে সনাতন ধর্মে আশ্রিত হয়ে বলবে—আমরা পর নই, আমরা অমৃতের সন্তান।
