Sunday, September 13, 2026

সধবা নারীর সিঁথির সিঁদুর রহস্য।

বিবাহিত হিন্দু নারী সিঁথিতে সিঁদুর পড়ে। মুসলিম ও খ্রীষ্টান ধর্মের নারীদের এই প্রচলন নেই। এই পার্থক্যের কারণ সংস্কৃতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক। এই ভিন্নতা থেকেই একজন যুক্তিবাদী হিন্দু নারী বা পুরুষের মনে সিঁথির সিঁদুর সম্পর্ককে প্রশ্ন ওঠে। যার জবাবে অনেক ধরণের speculation যৌক্তিক জল্পনা দেওয়া হয়। যার কোনো শাস্ত্রীয় বা যৌক্তিক কারণ নেই। 

অনেকে বলে থাকেন, যুদ্ধে বিজয়ী রাজারা নিজের আঙ্গুল কেটে পরাজিত সাম্রাজ্যের নারীরদের কপালে রক্ত পরিয়ে দিতেন, সেই থেকে এই প্রথা। অনেকে বলেন, এটা নারীদের অলঙ্কার। কেউ বলে সতীত্বের প্রতীক, কেউ বলে নারীকে অধীনত করে রাখার ব্যাবস্থা। প্রশ্ন সতীত্বের প্রমাণ কেন নারীকেই দিতে হবে? কেন পুরুষরা নিজের পতিত্ব বা পত্নী নিষ্ঠতার প্রমাণ নিজের কপালে নিয়ে বেড়ায় না?  প্রশ্নটা খুবই সাভাবিক ও যুক্তি পূর্ণ। এর জন্য আমাদের জানতে হবে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিবাহের আদর্শ আর অন্যান্য (ইসলাম, খ্রিস্টান, ইহুদী ) সমপ্রদায়ের বিবাহ আদর্শ এর মধ্যে কি তুলনা মুলক পার্থক্য রয়েছে। তারপর আসল কারণ উন্মোচন হবে। কারণ সিঁদুর নিয়ে এই আক্ষেপ ও প্রশ্ন গুলো এই আদর্শগত পার্থক্য থেকেই এসেছে। 

হিন্দু বিবাহ

হিন্দু নারী ও পুরুষ, সমাজিক স্বীকৃতিতে, সংসার ধর্ম পালনের শপথকে বিবাহ বলা হয়। প্রচচলিত সমজিক বিবাহ মধ্যে বৈধ অবৈধতা বর্ণিত হয়েছে। মনুস্মৃতিতে মোট ৮ প্রকার বিবাহের উল্লেখ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রথম চারটিকে (ব্রাহ্ম, দৈব, আর্ষ ও প্রাজাপত্য) সমাজে আদর্শ ও ‘ধর্ম্য’ (বৈধ বা পুণ্যময়) বলে স্বীকৃতি দেওয়া হতো। শেষের চারটিকে (আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ) সাধারণত ‘অধর্ম্য’ (নিন্দনীয় বা ক্ষেত্রবিশেষে অবৈধ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিবাহের পূর্বে বরপক্ষ ও কন্যা পক্ষের পরিবারে একটি সামাজিক আলোচনা হয়। যেখানে পাত্র ও পাত্রীর বিভিন্ন যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা হয়। ঘটক (যিনি দুই পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব আনেন) সে পত্র পক্ষের হয়ে কনে পক্ষকে সামর্থ্য অনুযায়ী একটি যৌতুক দাবী করে। কনে পক্ষ সম্মতি দিলেই বিয়ের পাকা কথা হয়। 

যৌতুক কেন? 

প্রাচীনকালে হিন্দু সমাজে কন্যাসন্তানের পৈতৃক সম্পত্তিতে কোনো উত্তরাধিকার বা আইনি অধিকার ছিল না। তাই বিয়ের সময় বাবা-মা  মেয়েকে যে গহনা, অর্থ বা উপহার দিতেন, তাকে বলা হতো ‘স্ত্রীধন’। এই সম্পদে শুধুমাত্র ওই মেয়েরই অধিকার থাকত, যা তার ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য দেওয়া হতো। কিন্তু কালক্রমে পৈতৃক সম্পত্তির বিকল্প হিসেবে দেওয়া এই উপহারটি পাত্রপক্ষের ‘দাবি’ বা ‘যৌতুকে’ পরিণত হয়।

সমাজে একটি প্রবণতা আছে মেয়েকে নিজেদের চেয়ে উঁচু বংশে বা বেশি শিক্ষিত বা আর্থিকভাবে বেশি সচ্ছল পাত্রের সাথে বিয়ে দেওয়ার। যখন অনেক কনেপক্ষ প্রতিষ্ঠিত পাত্রের দিকে আগ্রহী হয়, তখন পাত্রের চাহিদা বেড়ে যায়। এই সুযোগে পাত্রপক্ষ নিজেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী যৌতুক দাবি করার সুযোগ পেয়ে যায়। 

শাস্ত্রীয় মত: হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে (যেমন মনুস্মৃতিতে) যৌতুক প্রথার কোনো সমর্থন নেই। বরং, অর্থের বিনিময়ে কন্যাদান বা বিয়ের জন্য অর্থ দাবি করাকে অত্যন্ত হীন এবং পাপ কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

আধুনিক ভারতে এই যৌতুক দাবি করা, দেওয়া বা নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। ‘যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৬১’ (Dowry Prohibition Act, 1961) অনুযায়ী এটি একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। খুব কম হলেও হিন্দু সমাজ এই ব্যবস্থাকে স্বীকার করেছে।

আশীর্বাদী

আশির্বাদী, দুই পক্ষের পরিবারের গুরুজণ ও আত্মীয় স্বজনরা পত্র ও পাত্রীর বাড়ি গিয়ে পরিবার সহ পাত্র-পাত্রীকে উপঢৌকন, উপহার ও আশীর্বাদ নিয়ে থাকেন। এই অনুষ্ঠানেই ওই সিঁদুর উপহার হিসেবে দেওয়া হয় যা মঙ্গলের প্রতীক।

বিবাহের প্রতিবেশী মহিলারা বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে আনন্দ করতে করতে ঘাটে যায়। ঘটে জল ভরে পত্র বা পাত্রীর মা ও মঙ্গল ঘট মাথায় করে গ্রাম দেবতা সহ, সমস্ত দেবী-দেবতাদের মন্দিরে ঢেলে নিজের সন্তান সন্ততির বিবাহে আসার জন্য নিমন্ত্রণ ও মঙ্গল কামনা করে। তারপর ওই জল ঘরে রেখে দেওয়া হয়। বিবাহের দিন পুরোহিত মশাই মঙ্গল ঘট স্থাপন করেন, এবং বেদ মন্ত্র দ্বারা ওই ঘটের মধ্যে সমস্ত দেবী দেবতাদের আবাহন করেন। 

এরপর ওই ঘটে পুঁজা করে যথা সম্ভব সেবা প্রদান করা হয়। কন্যার পিতা নিজের কন্যাকে ওই পাত্রের হাতে স্ব-সন্মানে অর্পণ করে। এর জন্য ওই জন্য ঘটের ওপর হাত রেখে কন্যার বাবা সংকল্প মন্ত্র পাঠ করেন, এরপর ওই পবিত্র ঘটের ওপর হাত রেখেই বরের হাতে নিজ কন্যার হাত তুলে দেয়। এরপর, একজন নাপিত ওই ঘটের ওপর সূত দিয়ে গিট বেঁধে দেয়। একে গাঁঠ বন্ধন বা গ্রন্থিবন্ধন বলা হয়। ওই সময় স্বামী ও স্ত্রী নিজেদের দাম্পত্য জীবনের জন্য শপথ নেয়। এরপর, সিঁদুর দান।

 সিঁদুর দান

ওঁ সৌভাগ্যং শোভনং চৈব সৌম্যং চৈব মম প্রিয়ে। সিন্দুরং ধারয়ামি ত্বাং সদা সুমঙ্গলি ভব।।”

মন্ত্রের অর্থ:

“ওঁ ( হে প্রিয়ে! তুমি) সৌভাগ্যবতী, শোভনরূপা (সুন্দরী) এবং সৌম্য (শান্ত) স্বভাবের অধিকারিণী হও। আমি তোমাকে এই সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছি, তুমি সর্বদা সুমঙ্গলী (কল্যাণময়ী সধবা নারী) হয়ে থেকো।”  

এছাড়াও বৈদিক আশীর্বাদ হিসেবে ঋগ্বেদের একটি মন্ত্র এই পর্বে উচ্চারিত হয়:

“ওঁ সুমঙ্গলিরিয়ং বধূরিমাং সমেত পশ্যত। সৌভাগ্যমস্যৈ দত্ত্বা যাথাস্তং বিপরেতন।।”

মন্ত্রের অর্থ: “এই বধূ অত্যন্ত সুমঙ্গলা, তোমরা সকলে এসে একে দেখো এবং একে সৌভাগ্য ও আশীর্বাদ প্রদান করে নিজ নিজ স্থানে ফিরে যাও।”  

অর্থাৎ সিঁদুর হলো স্বামীসহ সমগ্র বিশ্বের দেবী দেবতা, আত্মীয় স্বজনদের আশীর্বাদ। যা একজন নিষ্ঠাবান সধবা স্ত্রী সগৌরবে ধারণ করে। বিধবা হলে স্ত্রী নিজের সেই গৌরব হারায়, তখন তাঁর সিঁদুর ধুয়ে ফেলা হয়। তখন তাঁর, সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে তাঁর পুত্র। যে পুত্র ওই স্বামীরই অংশ। তখন সে আর সিঁদুর পড়ে না। তখন তাঁর স্বামী কেবল পরমেশ্বর ভগবান।

বৈধব্যকে হিন্দু দর্শনে কেবল একটি ‘অভাব’ বা ‘শূন্যতা’ হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটিকে ত্যাগের মাধ্যমে পরমাত্মার সাথে যুক্ত হওয়ার একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়। মীরাবাঈ-এর মতো সাধিকাদের জীবনেও আমরা এই দর্শন দেখেছি, যেখানে রক্তমাংসের কোনো মানুষ নয়, বরং পরমেশ্বর ভগবানই একমাত্র পতি বা রক্ষাকর্তা। তখন আর পার্থিব কোনো প্রতীকের (যেমন সিঁদুর) প্রয়োজন হয় না, কারণ ঈশ্বর নিরাকার ও সর্বব্যাপী।

সিঁদুর মুছে ফেলা মানে যে কোনো নারীর সম্মান বা গরিমা ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া নয়, বরং পার্থিব মোহ থেকে মুক্ত হয়ে পরমেশ্বরের চরণে নিজেকে সমর্পণ করা কিন্তু যারা সিঁদুর পড়াকে পরাধীনতা বা Old Fashion মনে করে। তাঁদের সিঁদুর না পড়লেও চলবে। কারণ মূল্যবোধ একেক জনের কাছে এক এক রকম। সেটা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। 

মুসলিম বিবাহ

মুসলিমদের ক্ষেত্রে নারী পুরুষ জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার চুক্তিকে নিকাহ বলা হয়। একজন পুরুষ নিজ সমর্থ আনুসারে  একাদধিক বিবাহ নিকাহ করতে পারে। মুসলিমদের নিকাহ চুক্তিতে মোহরানা, সম্মতি এবং সাক্ষীর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়া আনুসারে মোহরানা বা দেনমহর হলো নারীর আর্থিক নিরাপত্তা ও অধিকার। বলা হয়, এটি সম্পূর্ণভাবে নারীর নিজস্ব অধিকার। এই সম্পদে স্বামী বা নারীর নিজের বাবারও কোনো অধিকার থাকে না। এটি নারীর নিজস্ব আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। অনেক সময় মোহরানার একটি অংশ বাকি (Due) রাখা হয়। একে “মোহরে মুওয়াজ্জাল (Mahr Muwajjal)” বা বিলম্বিত মোহরানা বলা হয়। যা স্বামী যেকোনো সময় বা বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকেন। এটি হঠকারী বা কারণ ছাড়া তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি আইনি ও আর্থিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে এবং বিবাহ বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীর জন্য একটি আর্থিক নিরাপত্তা হিসেবে দাঁড়ায়।

বুখারীর এই ৫৩৫০ নম্বর হাদিসে হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত:

লিআনকারী স্বামী-স্ত্রীর (যারা একে অপরের বিরুদ্ধে শপথ করেছিল) উদ্দেশ্যে নবী মুহাম্মদ (সা.) বললেন, “তোমাদের হিসাব আল্লাহর কাছে। তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন অবশ্যই মিথ্যাবাদী। এখন এই নারীর ওপর তোমার (স্বামীর) আর কোনো অধিকার নেই।”

​তখন স্বামীটি জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসুল! আমার সম্পদের (অর্থাৎ স্ত্রীকে দেওয়া মোহরানার) কী হবে?”

​এর জবাবে নবী (সা.) বললেন:

​”তোমার কোনো সম্পদ (মোহরানা) ফেরত পাওয়ার অধিকার নেই। তুমি যদি সত্যবাদী হও (অর্থাৎ স্ত্রী যদি সত্যিই অপরাধী হয়), তবে তুমি যে মোহরানা দিয়েছ, তা হলো তার সাথে তোমার বৈধ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বিনিময়। আর তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও, তবে সেই মোহরানা ফেরত পাওয়ার অধিকার তোমার আরও অনেক দূরে।”

” মোহরানা হলো তার সাথে বৈধ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বিনিময়।” আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই কথাটি শুনলে অনেকের মনে হতে পারে যে এটি হয়তো নারীকে “কেনার” বা শারীরিক সম্পর্ককে একটি “পণ্য” হিসেবে দেখার নামান্তর। কিন্তু ইসলামি আইন বা শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটি গভীর আইনি ও কাঠামোগত ব্যাখ্যা রয়েছে। এই উক্তি থেকে শুধু “বৈধ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বিনিময়” । এই অর্ধ সত্য দ্বিরা অনেক সময় বিভ্রান্ত করে।

অর্থাৎ, একজন নারী এবং পুরুষ সামাজিক ভাবে যৌণ-সম্পর্ক ও সন্তান উৎপাদনের স্বীকৃতিকে নিকাহ বলা হয়। যদি ব্যাভিচার বা অন্য না জায়েয উপায়ে যৌণ সম্পর্ককে ও সন্তান জন্ম হয়, তবে সেটাকে জিনা করা বলা হয়। এটাকে ইসলামিক আইনে হারাম বলা হয়। হারাম শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো অবৈধ। এখানে স্বামী তার স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে। হিন্দু সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদ পাপ। কারণ বিবাহে দেবতা, সমাজ ও পরিবারের সম্পর্ক জরিয়ে থাকে। বিবাহ বিচ্ছেদ হলে ওই শপথ মিথ্যা প্রমানিত হয়, সমাজের আশীর্বাদ ও দেবতার অপমান হয়। হিন্দু ধর্মে যেটা পাপ, সেই পাপকে ইসলামে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।   

যুদ্ধে বিজয়ের পর, বিজিত পক্ষের নারীদের ( সামাজিক সুরক্ষার জন্য ) অন্যান্য রানীদের সঙ্গে তাদের সেবা করার জন্য দাসী হিসেবে একটি কক্ষে বা মহলে রাখা হতো, ওই মহলকে “হরম খানা” বা “হারেম মহল” বলা হতো।  আরবি ح-ر-م (হ-র-ম) শব্দধাতু ব্যবহার করা হয় নিষিদ্ধ, সংরক্ষিত, অলঙ্ঘনীয় বোঝাতে। এর ঠিক বিপরীত শব্দ হল হালাল বা বৈধ অর্থে। ইসলামে ওই বন্দিনী দাসীকেও নিকহ করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

এখন আপনার মনে আবার যদি প্রশ্ন ওঠে, একজন বিজিত পক্ষের নারী কিভাবে তাঁর স্বামী, পুত্র এবং পুরুষদেরকে হত্যাকারীকে নিকাহ করবে, সেটা কিভাবে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এর জবাব আমার কাছে নেই। কোনো ইসলাম ধর্ম বিশারদ এর জবাব দিতে পারবেন। আমার কাছে এর কোনো জবাব নেই।

ইহুদী বিবাহ

ইহুদি ধর্মে বিবাহকে বলা হয় ‘কিদ্দুশিন’ (Kiddushin), যার অর্থ ‘পবিত্রকরণ‘ বা ‘উৎসর্গ করা‘। ইহুদিদের মতে এটি স্বামী, স্ত্রী এবং ঈশ্বরের মধ্যে একটি পবিত্র চুক্তি। ইহুদি বিবাহের সাথে ইসলামি বিবাহের (নিকাহ) বেশ কিছু কাঠামোগত মিল রয়েছে।  তবে দেনমোহর ব্যাবস্থা নেই। ইহুদি বিবাহে একটি লিখিত চুক্তিপত্র লেখা হয়, যাকে কেতুবাহ বলা হয়। এটি মূলত ইসলামি কাবিননামার মতো একটি লিখিত চুক্তিপত্র। এতে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আইনি, আর্থিক এবং অন্যান্য দায়িত্বের কথা স্পষ্টভাবে লেখা থাকে। বিবাহ বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী কী পরিমাণ আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন, তা এই কেতুবাহতে আগেই নির্ধারিত থাকে।

সব থেকে interesting বিষয় হলো, অনুষ্ঠানের একেবারে শেষে বর পা দিয়ে একটি কাঁচের গ্লাস বা পাত্র ভেঙে ফেলেন। আনন্দের এই মুহূর্তেও জেরুজালেমের পবিত্র মন্দির ধ্বংসের ঐতিহাসিক শোককে স্মরণ করার প্রতীকী হিসেবে প্রথাটি পালন করা হয়। 

খ্রিস্টান বিবাহ

খ্রিস্টান ধর্মে বিবাহকে মূলত একটি ‘পবিত্র সংস্কার’ (Sacrament) বা ঐশ্বরিক অঙ্গীকার (Covenant) হিসেবে দেখা হয়। বাইবেলের বিশ্বাস অনুযায়ী, “ঈশ্বর যাদের যুক্ত করেছেন, মানুষ যেন তাদের আলাদা না করে।” এদের বিবাহের সাথে হিন্দু বিবাহের আত্মিক শপথের ধারণার বেশি মিল পাওয়া যায়। তবে প্রটিস্টানরা ডিভোর্স দেওয়াকে বৈধতা দিয়েছে।  যেভাবে যিশু হলেন তাঁর সম্প্রদায়ের মস্তক, সম্প্রদায় তাঁর দেহ। সেভাবে চার্চের ফাদার হোলো মণ্ডলীর মস্তক, সেভাবে পুরুষ হোল পরিবারে প্রধান বা মস্তক এবং স্ত্রী ও তাঁর পরিবার তাঁর দেহ। নিজ সম্প্রদায় ভুক্ত না হয়ে যদি কেউ অন্য সম্প্রদায়ে বিবাহ করে তবে তাকে ধর্মচ্যুত বলা হয়। তাঁর সন্তান পাপীদের মধ্যে গণ্য হয়। ৮ টি  ‘পবিত্র সংস্কার’ (Sacrament) দ্বারা একজন মানুষ ইস্বরের আনুগ্রহ পায়। 

প্রার্থনার সময় কেবল নারীরাই মাথায় কাপড় নেন। এখানে দেবতা পুরুষ, সমাজ প্রধান।

পুরুষপ্রধান সমাজ

তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন, পুরুষরা কেন গর্ব করে কোনো প্রতীক ধারণ করে না? কেন প্রতিটি দেশেই নারীদের ওপর এই দায় চাপানো হয় ? এর সৎ ও সোজা সাপটা জবাব হলো অধিকার ভেদ। অধিকার ভেদের তাৎপর্য জানলে আর কোনো প্রশ্নই থাকবে না । 

অধিকারভেদের তাৎপর্য

এই জগতে সব কিছুর মধ্যেই অধিকার ভেদ আছে। যেমন: (১) মাটির কলসী মাটি দিয়েই তৈরী হয়। কিন্তু সব মাটি দিয়েই কি কলসী তৈরী হয়? কেবল ভেজা মাটি, তাও আবার নদীর জলের নীচে জমে থাকা এঁটেল বা কাদা মাটিই কলসী নির্মাণে উপযুক্ত। ওই উপযুক্ত মাটির মধ্যেও গুণের ভেদ আছে। অর্থাৎ, সব এঁটেল মাটিতেও কলসী তৈরী হয় না। (২) কলসীর মধ্যে জল রাখা যায়, কিন্তু ভাত রান্না করা যায় না। ভাতের জন্য হাড়ি দরকার। হাঁড়িতে প্রয়োজনে জল রাখাই যায় কিন্তু জল রাখার জন্য কলসী প্রশস্থ। এটাই অধিকারের ভেদের তাৎপর্য।

প্রত্যেক পুরুষের জন্ম একটি নারীর গর্ভ থেকে। নারীরাই ধারণ করে, পালন করে, পোষণ করে, যদি ধারণ, পালন ও পোষণ নারীর অধিকার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। তবে সমাজে বা পরিবারে নারীর গুরুত্ব কমে যাবে। টাকা দিলেই কাজের লোক পাওয়া যাবে, শারীরিক সুখের সামগ্রী কিনে আনবে। 

কলসি ছারাও হাঁড়িতে খাওয়ারের জল রাখা যায়। তাই বলে, যদি সবাই হাড়িতে জল রাখা শুরু করে, তাহলে কলসীর ব্যবহার তো কমে যাবে, ফলস্বরূপ কলসি নির্মাণ হবে না। এবং বাস্তবে এতাই হয়েছে। আজকাল আমরা কেউ মাটির কলসী বা হাড়ি ব্যবহার করি না। প্রায় প্রত্যেক বাড়ীতে জলের নল বা একোয়া গার্ড ফিল্টার ব্যবহার হয়। মাটির হাড়ি ব্যবহার হয় না, প্রায় সবাই অ্যালুমিনিয়ামের হাড়ি বা রাইস কুকার ব্যবহার করে। কারণ এটির টেকসই ভালো, ঝামেলা কম।

আজকাল সিঁদুরের জায়গায় মার্কার ব্যাবহার করা হয়। হয়তো তাই সিঁঁদুরকে এতো তাচছিল্যা হতে হচ্ছে।  পাত্র যতই আধুনিক বা দামি হোক না কেন, ভেতরে চাল আর জল না দিলে যেমন ভাত হবে না, ঠিক তেমনি বাইরে যতই আধুনিক বা সাধু সাজা হোক না কেন, অন্তরে প্রকৃত শুদ্ধতা না থাকলে কোনো লাভ নেই। 

এভাবেই মানুষের প্রয়োজন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে সাথে বাহ্যিক রূপ বদলে যায়। কিন্তু লক্ষ্য করুন, পাত্র বদলে গেলেও ‘জল রাখার প্রয়োজনীয়তা’ কিন্তু বদলায়নি। ঠিক তেমনি, যুগের পরিবর্তনে হয়তো সিঁদুর বা তিলক ধারণের প্রথা বা আঙ্গিক বদলে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের সমর্পণ, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের যে মূল তৃষ্ণা— তা যুগে যুগে একই থাকে।

উপসংহার:

ধর্মতাত্ত্বিক বা ইতিহাসবিদরা হয়তো সেই নির্দিষ্ট অন্ধকারের যুগের প্রেক্ষাপটে এটিকে ‘অনিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার একটি উপায়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আবেগ এবং নৈতিকতার জায়গা থেকে বিচার করলে আপনার যুক্তির সাথে দ্বিমত পোষণের কোনো অবকাশ নেই। মানুষের নৈতিকতা ও চিন্তাধারার বিবর্তনের ফলেই আজ সমাজ এই ঐতিহাসিক প্রথাগুলোকে প্রশ্ন করতে শিখেছে, যা একটি সুস্থ চিন্তন প্রক্রিয়ার লক্ষণ। 

বিবাহিত স্ত্রীর স্বামী একজন পুরুষ। পুরুষের স্বামী তাঁর গুরু, গুরুর স্বামী ঈশ্বর। সংস্কৃত বা বাংলা ভাষায় “স্বামী” শব্দটির মূল অর্থ কেবল ‘স্ত্রী-র পতি’ নয়, এর অর্থ হলো প্রভু, রক্ষাকর্তা বা ঈশ্বর। স্ত্রী যেমন তার স্বামীর প্রতি সমর্পিত হয়ে সিঁদুর ধারণ করেন, ঠিক তেমনি পুরুষরাও তাদের পরম স্বামী বা ঈশ্বর/গুরুর প্রতি সমর্পিত হয়ে তিলক ধারণ করেন। অর্থাৎ, তিলক হলো ঈশ্বরের কাছে পুরুষের অহংকার ত্যাগের বা দাসত্ব স্বীকারের প্রতীক। সেই জন্যই দেখবেন বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত এঁদের কপালে ভিন্ন ভিন্ন তিলক ধরনের প্রথা আছে। এগুলো কোনো মেকআপ বা গেটআপ নয়। পুরুষ নিজ নিজ সমপ্রদায়ের স্বামীর তিলক ধারণ করে।

আজ কাল এই তিল ধারণের একটা ফ্যাশন ট্রেন্ড চলছে। যে যত অসাধু, সে তত রং বেরঙের তিলক ধারণ করে নিজেকে ভক্ত প্রচার করছে। কেউ কেউ নিরামিষ আহার খাওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন, কেউ কেউ আবার আমিষ খাবারের উপদেশ দিয়ে শাস্ত্রের কথা বলছেন। ভ্রমর আর গু খাওয়া পোকা দুটোই ফুলের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে।

——- ইতি                                  

আশা করছি আমার এই প্রয়াস আপনারা পছন্দ করবেন, এবং এই প্রয়াসকে অব্যাহত রাখতে অমাকে সাহায্য করবেন। আপনি এই পোস্ট শেয়ার করুন এবং এই ওয়েবসাইটকে সচল রাখার জন্য কিছু সাহায্য করুন।

Himadri

স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, সমাজকর্মী, সনাতনী হিন্দু জাগরণ মঞ্চের একজন লেখক এবং Blogger.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *