Friday, November 6, 2026

চলচ্চিত্র পর্যালোচনা: নমিত মালহোত্রার রামায়ণ মুভি (প্রথম ভাগ)

Ramayana

নমিত মালহোত্রার রামায়ণ (প্রথম ভাগ) মুক্তি পেয়েছে 5ই নভেম্বরে। যা দেখার পর একটা মিক্সড ফিলিং হচ্ছে। ভালো বা খারাপের অনুভূতি কিভাবে বলবো, বুঝতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে, প্রযুক্তির চাকচিক্য দেখতে গিয়ে নির্মাতারা রামায়ণের আত্মিক গভীরতা যেন হারিয়ে ফেলেছে। কাহিনীর আসল আনন্দ এবং আত্মিক গভীরতাই যেন উপেক্ষা করা হয়েছে।

চূড়ান্ত অভিমত: Film দেখার পর আমার যে অনুভূতি, সেটা হল,  পশ্চিমা সিনেমাটিক স্কেলে মোড়া এক চোখধাঁধানো কারিগরি চমক। ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের দিক থেকে ছবিটি অতুলনীয় হলেও, চিত্রনাট্য, চরিত্রায়ণ এবং নৈতিক ভারসাম্যের দিক থেকে এটি মারাত্মকভাবে বিভ্রান্ত।

​কারিগরি নির্মাণ ও আবহসঙ্গীত:

​একটি সিনেমাটিক প্রোডাকশন হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়ানোর যে দুঃসাহস নির্মাতারা দেখিয়েছেন, তা ভারতীয় সিনেমার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এক বড় পদক্ষেপ।

  • ​ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (VFX) ও ফ্রেমওয়ার্ক: নমিত মালহোত্রার DNEG-এর অভিজ্ঞতা প্রতিটি ফ্রেমে স্পষ্ট। অযোধ্যার স্থাপত্য, ত্রিকূট পর্বতের চূড়ায় স্বর্ণলঙ্কার বিস্তার, কিংবা জটায়ুর সাথে আকাশযুদ্ধের অ্যাকশন কোরিওগ্রাফি দর্শকের চোখে বিস্ময় তৈরি করে। অতীতের দুর্বল অ্যানিমেশনের মতো এটি খেলো মনে হয় না; আন্তর্জাতিক মানের IMAX পর্দার উপযুক্ত করেই প্রতিটি দৃশ্য সাজানো হয়েছে। কিছু কিছু CGI রাক্ষস দৈত্যদের বাদ দিলে VFX কে নিঃসন্দেহে 9.5/10 দেওয়া যায়।
  • ​হ্যান্স জিমারের সাউন্ড ডিজাইন: পশ্চিমা ব্রাস, তীব্র অপেরা কোরাস এবং ভারী সাব-বেসের সমন্বয়ে হ্যান্স জিমার যে আবহ তৈরি করেছেন, তা এক কথায় অসামান্য। বিশেষ করে লঙ্কার রাবণের দৃশ্যগুলোতে সাউন্ডস্কেপ এমন এক গা ছমছমে গাম্ভীর্য আনে সেই অনুরণন অনেকক্ষণ কানে বাজে। এমনকি ফিল্ম থেকে বেরিয়ে আসার পরও থেকে যায়।

​কিন্তু সিনেমা কেবল কালার গ্রেডিং, রেন্ডারিং বাজেট আর সাউন্ড ডিজাইনের সরল পাটিগণিত নয়। প্রযুক্তির ব্যবহার সপোর্ট করে গল্পকে। যেখানে আমরা ছোটো থেকেই এই কাহিনী শুনে আসছি, সেটা পর্দায় একেবারেই আলাদা ন্যারেটিভ দিয়ে দেখছি। —আর ঠিক সেখানেই ছবিটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।

​মূল ত্রুটি: চরিত্রের ভারসাম্যহীনতা ও রাবণের অযৌক্তিক গ্লোরিফিকেশন

​এই ছবির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে এর মৌলিক চরিত্রায়ণে: যেভাবে রাবণকে পর্দায় উপস্থাপন করা হয়েছে, তার তুলনায় প্রভু শ্রীরামের চরিত্রটি একেবারেই অনুজ্জ্বল ও ম্লান ঠেকেছে। রামানায়ণ না হয়ে যেন এটি রাবনায়ান মনে হচ্ছে। 

​১. শ্রীরামের ভাবমূর্তিকে সংকুচিত করা।

​যে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উচ্চতা রামচন্দ্রকে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম‘ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, চিত্রনাট্য সেই ভিত্তিগুলোকেই তাড়াহুড়োয় উড়িয়ে দিয়েছে।

  • ​বাল্যকালের গুরুকুল জীবন, বিশ্বামিত্রের যজ্ঞরক্ষা, হরধনু ভঙ্গ, কিংবা পিতার সত্যরক্ষায় অকাতরে চৌদ্দ বছরের বনবাস মেনে নেওয়ার সেই শান্ত গাম্ভীর্য—সবকিছুই খুব দ্রুত কয়েকটি মন্টেজ গানের মতো ফুরিয়ে যায়।
  • ​দ্রুত অ্যাকশন দৃশ্যে পৌঁছানোর তাগিদে চিত্রনাট্যকার রামের ভেতরের সেই তেজ, স্থৈর্য এবং ক্ষমাকে যথাযথ স্থান দেননি। ফলে রামচন্দ্রকে মহাজাগতিক সত্য ও ধর্মের মূর্ত প্রতীক মনে না হয়ে একটি দ্রুতগতির চিত্রনাট্যের সাধারণ এক অসহায় নায়ক বলে মনে হয়। রণবীর কাপুরের শুধু Face Value ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

​২. রাবণের অযাচিত মহিমান্বিতকরণ

​ঠিক বিপরীতে, ক্যামেরা এবং গল্পের গতি রাবণের পটভূমিতে এসে থমকে দাঁড়ায়, তাকে বাড়তি সহানুভূতি দিয়ে এক ট্র্যাজিক ‘অ্যান্টি-হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক চেষ্টা চোখে পড়ে।

  • ​আধুনিক তাত্ত্বিক চশমায় ইতিহাসকে নতুন রূপ দিতে গিয়ে রাবণের বংশকে এক শোষিত, কোণঠাসা জাতি হিসেবে দেখানো হয়েছে—যা বাল্মীকি রামায়ণ বা রামচরিতমানস—উভয় শাস্ত্রের সাথেই সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

যে লঙ্কার জন্য রাবণ লড়াই করেছিলো, সেটা কি আদৌ রাক্ষসদের ছিলো? কোনো ভাবেই না। উত্তরকাণ্ডের ৪র্থ সর্গে বর্ণিত আছে, দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ত্রিকূট পর্বতের শিখরে এই অপূর্ব স্বর্ণপুরী নির্মাণ করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল দেবতাদের জন্য একটি নিরাপদ বাসস্থান তৈরি করা, যা সমুদ্রের মাঝে অপ্রবেশ্য দুর্গের মতো থাকবে। পরবর্তীকালে রাক্ষস হেতি ও প্রহেতির বংশধর তিন রাক্ষস ভ্রাতা—মালী, সুমালী এবং মাল্যবান (সুমালী ছিলেন রাবণের মাতামহ বা নানা)—মহাদেব ও ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে বিশ্বকর্মার কাছে যান এবং নির্মিত এই শূন্য স্বর্ণপুরীটি জোরপূর্বক দাবি করে সেখানে বসবাস শুরু করেন।

কিন্তু ফিল্মে দেখানো হয়েছে, রাক্ষসদের সাম্রাজ্য দখল করার জন্য দেবতারা যুদ্ধ করতে এসেছিল এবং যুদ্ধে পরাজিত করে, কুবেরকে রাজভার দিয়ে দেন। এখানে কুবেরের দ্বারা রাক্ষসদের শোষণ করতেও দেখানো হয়েছে।

আসল কাহিনীতে মহর্ষি বিশ্রবা ও তাঁর পত্নী ইড়বিড়া’র পুত্র কুবের কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার কৃপায় লোকপাল ও ধনাধিপতির পদ পান। বসবাস ও শাসনের জন্য একটি উপযুক্ত স্থানের প্রয়োজন হলে তাঁর পিতা মহর্ষি বিশ্রবা তাঁকে পরামর্শ দেন: “সমুদ্রতীরের ত্রিকূট পর্বতে বিশ্বকর্মার তৈরি যে পরিত্যক্ত স্বর্ণলঙ্কা পড়ে রয়েছে, তা এখন শূন্য। তুমি সেখানে গিয়ে তোমার অনুগত যক্ষদের নিয়ে ধর্মসম্মতভাবে বাস করো।”

  • ​রাবণ কোনো নিপীড়িত চরিত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ, মহাজ্ঞানী, বেদজ্ঞ এবং শিবভক্ত। তা সত্ত্বেও অহংকার (অহংকার), কাম এবং মোহের বশে অন্ধ এক অত্যাচারী রাজা। তাঁর পতন তাঁর নিজের অবিবেচক অধর্মের ফসল।
  • ​রাবণের স্ক্রিন প্রেজেন্স: তাঁর রাগ ও সংলাপকে এমনভাবে বীরত্বপূর্ণ আলোয় তুলে ধরা হয়েছে যে দর্শককে প্রায় তাঁর পক্ষ নিতে বাধ্য করা হয়। ফলে লঙ্কার রাজা হয়ে ওঠেন মূল আকর্ষণ, আর ধর্মের অবতার শ্রীরাম দাঁড়িয়ে থাকেন ব্যাকগ্রাউন্ডে।

​৩. দুর্বল সংলাপ ও প্রাণহীন অভিনয়

​সংলাপের ভাষা পৌরাণিক ইতিহাসের মহিমা এবং আধুনিক বাস্তবতার দ্বন্দ্বে পথ হারিয়েছে।

  • ​অভিনেতাদের সংলাপ নিক্ষেপ (Dialogue Delivery) অত্যন্ত চটুল ও নিরুত্তাপ। যে রামায়ণে ভাষার প্রতি ধাপে একটি অলৌকিক গাম্ভীর্য ও ছন্দ থাকার কথা, সেখানে অনেক চরিত্রকেই মনে হয়েছে আধুনিক কাল্পনিক ড্রামার সাধারণ সংলাপ আওড়াচ্ছেন।
  • ​অরণ্যকাণ্ডের মতো টানটান উত্তেজনার পর্বগুলোতেও চরিত্রের অভিব্যক্তিতে আধ্যাত্মিক যন্ত্রণা বা গভীর সংকল্পের চেয়ে মেকি নাটকীয়তা বেশি প্রকাশ পেয়েছে।

​উপসংহার

​রামায়ণ কোনো সাধারণ ‘ভালো বনাম মন্দ’ ফর্মুলার হলিউডি ফ্যান্টাসি ফ্র্যাঞ্চাইজি নয়। এটি আত্মত্যাগ, ধর্ম, প্রতিশ্রুতি এবং আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার এক জীবন্ত ইতিহাস। রামায়ণ মুভি কেবল আন্তর্জাতিক দর্শকদের তাক লাগাতে গিয়ে যদি রামের মহত্ত্বকে কেটেছেঁটে রাবণকে লাইমলাইটে বসিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেই সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

​নমিত মালহোত্রার দল যদি প্রমাণ করতে চেয়ে থাকেন যে ভারত বিশ্বমানের VFX এবং হলিউডি শব্দ সংযোজনা বানাতে পারে, তবে তাঁরা সফল। কিন্তু যদি তাঁরা রামের আত্মার প্রতিফলন ঘটাতে চেয়ে থাকেন, তবে বলতেই হয়—সোনালী লঙ্কার ঝকমকে ভিএফএক্সে চোখ জুড়োলেও, রামায়ণের চিরায়ত প্রাণটুকু পর্দায় অধরাই থেকে গেছে।

Himadri

স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, সমাজকর্মী, সনাতনী হিন্দু জাগরণ মঞ্চের একজন লেখক এবং Blogger.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *