Gen Z ম্যানিপুলেশন: কীভাবে তরুণদের আবেগকে হাতিয়ার করা হচ্ছে?
১৯৯১ সালে বিখ্যাত লেখক ডগলাস কোপল্যান্ড (Douglas Coupland) তার একটি উপন্যাসে তৎকালীন তরুণ প্রজন্মের নাম দেন “Generation X” (জেনারেশন এক্স)। এরপরের প্রজন্মটিকে মিডিয়া স্বাভাবিকভাবেই বর্ণমালার ক্রমানুসারে ডাকতে শুরু করে “Generation Y” (যাদের আমরা বর্তমানে ‘Millennials’ বা মিলেনিয়াল নামে সবচেয়ে বেশি চিনি)। মিলেনিয়ালদের পরবর্তী প্রজন্ম, অর্থাৎ যারা নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বা তার পরে জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের বোঝাতে প্লেসহোল্ডার হিসেবে বর্ণমালার পরবর্তী অক্ষর দিয়ে “Generation Z” নামটি ব্যবহার করা শুরু হয়।
প্রাথমিক অবস্থায় গবেষক ও মার্কেটাররা একেবারেই নিশ্চিত ছিলেন না যে “Generation Z” নামটিই শেষ পর্যন্ত টিকে যাবে। ২০০০ এবং ২০১০-এর দশকে ডেমোগ্রাফি বিশেষজ্ঞরা এই প্রজন্মের জন্য আরও বেশ কিছু আকর্ষণীয় নামের প্রস্তাব দিয়েছিলেন:
iGeneration (আই-জেনারেশন): মনোবিজ্ঞানী জিন টুয়েঞ্জ (Jean Twenge) এই নামটির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যেহেতু এই প্রজন্মই প্রথম যারা ছোটবেলা থেকে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন (বিশেষ করে অ্যাপল-এর ‘i’ প্রোডাক্ট) এবং সোশ্যাল মিডিয়া দেখে বড় হয়েছে, তাই এই নামটি বেশ যুৎসই ছিল।
Post-Millennials (পোস্ট-মিলেনিয়ালস): মিলেনিয়াল প্রজন্মের ঠিক পরেই আসার কারণে এই নামটিও বহুল ব্যবহৃত হতো। এছাড়াও Homelanders এবং Centennials নামগুলোও বেশ কিছুদিন চর্চায় ছিল।
কবে থেকে এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেল?
২০১৮-২০১৯ সালের দিকে “Gen Z” এবং এর থেকে তৈরি হওয়া ইন্টারনেট স্ল্যাং “Zoomer” (জুমার) সোশ্যাল মিডিয়া এবং গুগল সার্চে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
অবশেষে ২০১৯ সালের শুরুতে, বিশ্বখ্যাত গবেষণা সংস্থা Pew Research Center তাদের ব্যবহৃত “Post-Millennial” নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং “Generation Z” নামটি চিরস্থায়ীভাবে গ্রহণ করে। তাদের এই ঘোষণার মাধ্যমেই নিশ্চিত হয়ে যায় যে, সাংস্কৃতিক এই লড়াইয়ে “জেন জি” নামটিই জয়লাভ করেছে।
বামপন্থী মনস্তত্ত্ব প্রয়োগ
যদিও জেনারেশন Z রাজনৈতিকভাবে কোনো একক গোষ্ঠী বা মনোলিথ (monolith) নয়, তবে এই প্রজন্মের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ঐতিহ্যবাহী বামপন্থীরা সক্রিয়তার সঙ্গে নিজের সঙ্গে জুড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বাম পন্থীরা যুব সমাজকে হামেশাই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। উষ্ণ রক্ত আর অবুঝ মন ঝাপিয়ে পড়ে যে কোনো আগুনে। আর পেছন থেকে বসে স্বার্থ সিদ্ধি করে বামপন্থী নেতারা।
আন্দোলন কুক্ষিগত করা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় আন্দোলন কুক্ষিগত করার কৌশলকে বলা হয় ‘Co-optation’ বা আন্দোলনকে হাইজ্যাক করা। যখন সমাজে কোনো নতুন সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় (যা বর্তমানে জেন জি-র মধ্যে দেখা যাচ্ছে), তখন পুরোনো বা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো সেই ক্ষোভের সাথে নিজেদের মতাদর্শকে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। উদ্দেশ্য একটাই—তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত শক্তিকে নিজেদের ভোটব্যাংক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার শক্তিতে রূপান্তর করা। প্রথাগত বামপন্থীরা বর্তমানে ঠিক এই কাজটিই করে নিজেদের হারানো প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
আবেগ ও তারুণ্যের পুঁজি
যেকোনো বয়সের মানুষের তুলনায় তরুণদের মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার এক তীব্র প্রবৃত্তি থাকে। আপনি যাকে “উষ্ণ রক্ত আর অবুঝ মন” বলেছেন, তা মূলত তারুণ্যের সেই আদর্শবাদ (Idealism) যেখানে লাভ-ক্ষতির হিসেবের চেয়ে ন্যায়-অন্যায় বেশি গুরুত্ব পায়। প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলগুলো—বিশেষ করে প্রথাগত বামপন্থী কাঠামোগুলো—সবসময়ই এই আদর্শবাদকে বিপ্লব বা পরিবর্তনের প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া মাইন্ড প্রোগ্রাম
Amazon Prime-এর The Boys এবং এর পরবর্তী স্পিন-অফ সিরিজ (যার আসল নাম Gen V, তবে এটি সম্পূর্ণভাবে ‘জেন জি’ বা Gen Z প্রজন্মকে ঘিরেই তৈরি)—এই দুটি শো আদতেই বর্তমান সমাজ, রাজনীতি এবং পুঁজিবাদের ওপর একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োগ বা ‘ডার্ক সাইকোলজিক্যাল স্টাডি’।
নির্মাতারা সুপারহিরো জনরার আড়ালে মূলত আধুনিক সমাজের মানসিক বিকৃতি এবং প্রজন্মের মধ্যকার সংঘাতকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। বিষয়টিকে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিচের কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা যায়:
Gen V (জেন ভি): জেন-জি (Gen Z) প্রজন্মের মানসিক ট্রমা
Gen V সিরিজে দেখানো হয়েছে ‘গডলকিন ইউনিভার্সিটি’-র তরুণ সুপারহিরোদের। এই সিরিজটি মূলত আধুনিক জেন-জি প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
চাপিয়ে দেওয়া বোঝা (Inherited Trauma): এই তরুণদের কেউই নিজে থেকে সুপারহিরো হতে চায়নি। তাদের বাবা-মা টাকার লোভে বা খ্যাতির আশায় তাদের ছোটবেলায় ‘কম্পাউন্ড ভি’ (Compound V) ইনজেকশন দিয়েছিল। এটি বাস্তব জীবনের একটি দারুণ রূপক—যেখানে পূর্ববর্তী প্রজন্ম অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং একটি ভাঙাচোরা সমাজ বর্তমান জেন-জি-র ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে গেছে তাদের কোনো সম্মতি ছাড়াই।
মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মপরিচয়ের সংকট: এই সিরিজে তরুণদের যে সমস্যাগুলো দেখানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক। যেমন—অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে সেলফ-হার্ম বা নিজেকে আঘাত করা (ম্যারি), বডি ইমেজ ইস্যু বা ইটিং ডিসঅর্ডার (এমা), এবং নিজের লিঙ্গ বা আত্মপরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব (জর্ডান)। এগুলো সরাসরি আধুনিক জেন-জি প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সাথে মিলে যায়।
কর্পোরেট ম্যানিপুলেশন: সব প্রজন্মই হাতিয়ার
সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োগটি করে ‘ভট’ (Vought) কর্পোরেশন। হোমল্যান্ডার বা পুরোনো প্রজন্মের কাছে তারা ‘দেশপ্রেম’, ‘ধর্ম’ এবং ‘পারিবারিক মূল্যবোধ’-এর মতো পুরোনো আবেগগুলো বিক্রি করে।
অন্যদিকে, Gen V-তে দেখানো হয়, ভট কর্পোরেশন জেন-জি প্রজন্মের ‘ইন্টারসেকশনালিটি’, ‘মানবাধিকার’ বা ‘প্রগতিশীল (Woke) চিন্তাধারা’-কেও নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে ব্যবহার করছে। তরুণদের আবেগকে তারা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম এবং ফলোয়ার সংখ্যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে।
উপসংহার
যেকোনো শব্দের পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে অনেক মজার তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৯৩ সালের একটি সাধারণ বর্ণানুক্রমিক শব্দ আজ সারা বিশ্বের একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। যারা ডিজিটাল দুনিয়াকে নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে বড় হয়েছে, সেই “জেন জি” আজ শুধু একটি নাম নয়, বরং একটি নতুন জীবনধারার প্রতীক।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, পূর্ববর্তী প্রজন্মের চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও মানসিক ট্রমার বোঝা কাঁধে নিয়ে এই প্রজন্মটি বড় হচ্ছে। তারা প্রথাগত রাজনৈতিক নেতাদের চতুরতা যেমন বুঝতে পারছে, তেমনি কর্পোরেট পুঁজিবাদের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক চালের বিরুদ্ধেও নিজেদের মতো করে লড়ছে। এরা আবেগপ্রবণ হলেও অন্ধ নয়; বরং বাস্তবতার কঠোর কষাঘাতে তৈরি হওয়া এমন এক প্রজন্ম, যারা সবকিছুকে প্রশ্ন করতে জানে এবং কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর হাতের পুতুল হতে নারাজ।
