বেদে বিজ্ঞান আছে। প্রমাণ করতে পারবেন?
বলা হয় যে, বেদে বিজ্ঞান আছে। কিন্তু কেউ কি সেটা প্রমাণ করতে পেরেছে? জানা থাকলে জবাব দাও।
বলা হয় যে, বেদে বিজ্ঞান আছে। কিন্তু কেউ কি সেটা প্রমাণ করতে পেরেছে? জানা থাকলে জবাব দাও।
অবশ্যই বেদে বিজ্ঞান আছে। যখন বলা হয় “বেদে বিজ্ঞান” তখন আপনি কি বোঝেন? এই বিজ্ঞান কথার অর্থ ইংরেজী সায়েন্স নয়। বিজ্ঞান শব্দের অর্থ হলো ঈশ্বরের জ্ঞান। গীতায় জ্ঞান বিজ্ঞান যোগ বলে একটি অধ্যায় আছে। সেখানে তো কোনো ইলেক্টেন, প্রোটন বা গতিতত্ত্বের কথা নেই।
সেই বিজ্ঞান হলো Realized Knowledge। এই তাত্ত্বিক জ্ঞানকে যখন কেউ নিজের জীবনে সাধনার মাধ্যমে সরাসরি অনুভব বা উপলব্ধি করেন, তখন তাকে ‘বিজ্ঞান’ বলা হয়। ‘বি’ (বিশেষ) + ‘জ্ঞান’ = বিজ্ঞান। অর্থাৎ, তত্ত্বগতভাবে জানার পর তাকে নিজের ভেতরে অনুভব করা বা প্র্যাকটিক্যালি উপলব্ধি করাই হলো শ্রীমৎ ভগবৎগীতার বিজ্ঞান।
আধুনিক যুগে আমরা ‘বিজ্ঞান’ বলতে ভৌত জগৎ (Physical world) সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রমাণের ভিত্তিতে পাওয়া জ্ঞানকে বুঝি। ব্রিটিশ আমলে যখন ইংরেজি ‘Science’ শব্দের একটি যুৎসই বাংলা বা সংস্কৃত প্রতিশব্দ খোঁজা হচ্ছিল, তখন এই প্রাচীন ‘বিজ্ঞান’ (যার অর্থ ‘বিশেষ জ্ঞান’) শব্দটিকে বেছে নেওয়া হয় ।
তাই বলা যায়, গীতার ‘বিজ্ঞান’ হলো আধ্যাত্মিক উপলব্ধি বা ভিতরের জগৎকে জানার বিদ্যা, আর বর্তমানের ‘বিজ্ঞান’ হলো বস্তুজগৎ বা বাইরের জগৎকে বিশ্লেষণ করার বিদ্যা। শব্দ একটিই, কিন্তু সময় ও প্রেক্ষিত অনুযায়ী এর অর্থ বদলে গেছে।
যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন বেদে আধুনিক যুগের কোয়ান্টাম মেকানিক্স, জেনেটিক্স বা মহাকাশযানের ব্লু-প্রিন্ট আছে কি না, তবে তার উত্তর হবে—না, সরাসরি তা নেই। বেদ মূলত আধ্যাত্মিক, দার্শনিক এবং জীবনযাপনের বিধান সম্বলিত গ্রন্থ।
তবে, বিজ্ঞান বলতে আমরা যদি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, যৌক্তিক বিশ্লেষণ, গণিত এবং মহাবিশ্বকে বোঝার প্রণালীবদ্ধ পদ্ধতিকে বুঝি, তবে তার শক্তিশালী প্রমাণ বেদে অবশ্যই রয়েছে। হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন ঋষিদের বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার (Scientific temper) সুস্পষ্ট প্রমাণ সেখানে পাওয়া যায়।
বেদে থাকা বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রাচীন বিজ্ঞানের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. গণিত ও জ্যামিতি (শুল্বসূত্র):
বৈদিক যুগে যজ্ঞের বেদী (Altars) নির্মাণের জন্য জ্যামিতির নিখুঁত ব্যবহার শুরু হয়। বেদের অঙ্গ ‘শুল্বসূত্র’-এ (Sulba Sutras) জ্যামিতিক সূত্র দেওয়া আছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গ্রিক গণিতবিদ পিথাগোরাসের জন্মের বহু শতাব্দী আগেই শুল্বসূত্রে সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজ সংক্রান্ত উপপাদ্যটি (যা পিথাগোরাসের উপপাদ্য নামে পরিচিত) স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা আছে। প্রাচীন ভারতে যজ্ঞের বেদী (Altars) নির্মাণের জন্য নিখুঁত মাপজোখ এবং জ্যামিতির প্রয়োজন হতো। বেদী নির্মাণের এই গাণিতিক নিয়মকানুনগুলোই ‘শুল্বসূত্র’-এ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ‘শুল্ব’ বা ‘শুল্ব্য’ শব্দের অর্থ হলো দড়ি, কারণ প্রাচীনকালে দড়ি বা রজ্জু দিয়ে মেপে জ্যামিতিক আকার তৈরি করা হতো।
এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন এবং বিখ্যাত হলো বৌধায়ন শুল্বসূত্র (Baudhayana Sulba Sutra), যা আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে (গ্রিক গণিতবিদ পিথাগোরাসের জন্মের প্রায় আড়াইশো বছর আগে) রচিত। এখানেই আধুনিক পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।
শুল্বসূত্রে ধারণাটি ঠিক কীভাবে দেওয়া আছে, তা নিচে ভেঙে বোঝানো হলো:
“দীর্ঘচতুরস্রস্য অক্ষ্ণয়া রজ্জুঃ পার্শ্বমানী তির্যঙ্ মানী চ যৎ পৃথগ্ভূতে কুরুতস্তদুভয়ং করোতি॥”
শব্দের অর্থ ও জ্যামিতিক বিশ্লেষণ
এই সংস্কৃত শ্লোকটির প্রতিটি শব্দের গাণিতিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি খুব সহজে বোঝা যায়:
সম্পূর্ণ অর্থ:
একটি আয়তক্ষেত্রের দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ আলাদাভাবে যে ক্ষেত্রফল (বর্গক্ষেত্র) তৈরি করে, আয়তক্ষেত্রের কর্ণ একাই সেই দুটি ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান ক্ষেত্রফল তৈরি করে।
এটি গণিত এবং ইতিহাসের অন্যতম একটি চমকপ্রদ তথ্য যে, পিথাগোরাস নিজে জীবনে কোনো বই বা গ্রন্থ লিখে যাননি! তাঁর নিজের কথায় বা তাঁর স্বহস্তে লেখা কোনো দলিলে এই সূত্রের সরাসরি কোনো উল্লেখ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
পিথাগোরাসের মৃত্যুর প্রায় ২০০ বছর পর, গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিড (Euclid) তাঁর বিখ্যাত জ্যামিতির বই ‘এলিমেন্টস’ (Elements)-এ এই সূত্রটিকে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ করেন এবং এর গাণিতিক প্রমাণ দেন।
গ্রিক ভাষায়
Ἐν τοῖς ὀρθογωνίοις τριγώνοις τὸ ἀπὸ τῆς τὴν ὀρθὴν γωνίαν ὑποτεινούσης πλευρᾶς τετράγωνον ἴσον ἐστὶ τοῖς ἀπὸ τῶν τὴν ὀρθὴν γωνίαν περιεχουσῶν πλευρῶν τετραγώνοις.
টমাস এল. হিথ (Sir Thomas L. Heath)-এর যে বিখ্যাত এবং প্রামাণ্য ইংরেজি অনুবাদটির The Thirteen Books of Euclid’s Elements, টি আধুনিক যুগের ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে এই ইংরেজি অনুবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে।
তাহলে নিশ্চয়ই আর বলতে হবে না যে, বেদে কোথায় বিজ্ঞান আছে।
You must be logged in to post an answer.